যাঁরা এতিমখানা বা শিশুদের জন্য আবাসিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন এবং এতে অনুদান দেন, তাঁদের উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহৎ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটাই কি শিশুদের সহায়তা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়?
প্রতিষ্ঠানে থাকার ক্ষতিকর দিক
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও আবেগ বিকাশের ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশু যদি জীবনের প্রথম দিকে দীর্ঘ সময় কোনো প্রতিষ্ঠানে থাকে, তবে ছয় মাস পর থেকেই তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশের সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যারা ১৮ বছর পর প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসে, তাদের অনেকেই পরবর্তী জীবনে দারিদ্র্য, মানসিক স্বাস্থ্য–সংকট, গৃহহীনতা, মাদক ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
সেভ দ্য চিলড্রেনের ‘কিপিং চিলড্রেন আউট অব হার্মফুল ইনস্টিটিউশনস : হোয়াই উই শুড বি ইনভেস্টিং ইন ফ্যামিলি–বেজড কেয়ার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যত্ন শিশুদের জন্য নিরাপদ বা উপযুক্ত নয়। প্রতিষ্ঠানে বসবাসকারী শিশুরা সহিংসতা, নির্যাতন, অবহেলা ও পাচারের ঝুঁকিতে থাকে। যাদের দায়িত্ব শিশুদের দেখভাল করার সেই কর্মী, কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক এবং দর্শনার্থীদের মাধ্যমেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা ঘটছে।
সুরক্ষিত পারিবারিক পরিবেশে যথাযথ পরিচর্যা ও সহায়তা পাওয়া শিশুদের অধিকার। যত ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই পরিচালিত হোক না কেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই কখনো পরিবার থেকে পাওয়া ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিকল্প হতে পারে না।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে আছে ৮৫টি সরকার পরিচালিত ‘শিশু পরিবার’, যেখানে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ জন শিশু থাকতে পারে। সারা দেশে প্রায় ৪ হাজার বেসরকারি এতিমখানা বা অনাথ শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। কারণ, সব এতিমখানা ও শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে কোনো একক জাতীয় ডেটাবেজ নেই।
বাংলাদেশে বিভিন্ন এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্ধৃত তথ্যে ৪০ থেকে ৫০ লাখ এতিম শিশুর কথা বলা হয়। তবে এর মধ্যে এমন অনেক শিশুও রয়েছে, যাদের মা ও বাবার একজন এখনো জীবিত। তার মানে পরিবারে রেখেই তাদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, প্রতিবন্ধিতা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব—এসব কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের এতিমখানা বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে বাধ্য হয়। অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানকে প্রতিষ্ঠানে পাঠানোই শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করার একমাত্র পথ বলে মনে হয়। শুধু দারিদ্র্যের কারণে শিশুকে প্রতিষ্ঠানে পাঠানো যুক্তিযুক্ত নয়; এ বিষয়টি আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে।
বাংলাদেশে এতিমখানাসহ নানা প্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত খাদ্য, প্রশিক্ষিত সেবাদানকারী, শিক্ষা উপকরণ ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে। সেখানে শিশুরা নানা নির্যাতনের শিকার হয়, সেই খবর গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যত্নের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সরকারি নীতিনির্ধারক, অভিভাবক, কমিউনিটির সদস্য, সেবাদানকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা এখনো খুব সীমিত। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে।
শিশুদের জন্য বিকল্প পরিচর্যা নানা রকমের
পরিবার যদি শিশুকে সুরক্ষা দিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়, তাহলে রাষ্ট্রকে বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন নিকটাত্মীয়-পরিজন বা আগ্রহী পালক পরিবারের কাছে রাখা, দত্তকের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। যদি এগুলোর কোনোটিই শিশুর জন্য উপযুক্ত না হয়, শুধু তখনই প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। যেকোনো ব্যবস্থায় শিশুদের রাখার আগে বিদ্যমান বিকল্পগুলো যাচাই এবং সেগুলোর সুবিধা-অসুবিধা বিশ্লেষণ করতে হবে। শিশুর মতামত শোনা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’কে আমলে নেওয়া প্রয়োজন। সব ধরনের বিকল্প পরিচর্যার নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
নানা রকমের বিকল্প পরিচর্যাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যত্ন হওয়া উচিত একেবারে শেষ ব্যবস্থা। যদি কোনো শিশুকে প্রতিষ্ঠানে রাখতেই হয়, তবে সেটি হতে হবে সীমিত সময়ের জন্য, শিশুর নির্দিষ্ট প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখে।
বর্তমানে নানা দেশে জোর দেওয়া হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া প্রতিরোধে, দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তা প্রদানে এবং পরিবারভিত্তিক নানা ধরনের বিকল্প পরিচর্যা গড়ে তোলায়। সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠান থাকছে; কিন্তু সে ক্ষেত্রেও বড় প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ছোট ও পরিবারসদৃশ পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যার ব্যয় পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার তুলনায় ৬ থেকে ১০ গুণ বেশি। অর্থাৎ পরিবারভিত্তিক যত্নে বিনিয়োগের পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে।
আমাদের করণীয়
পরিবারভিত্তিক সহায়তার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক সেবার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের শিশুসুরক্ষা–ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা। বর্তমান বিশ্বে বিকল্প পরিচর্যা নিয়ে যা হচ্ছে এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো যে পরামর্শ দিচ্ছে, আমরা তার বিপরীত মেরুতে আছি। এ অবস্থার অবসান প্রয়োজন।
শিশুদের অপ্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানে পাঠানো ঠেকাতে পরিবারকে সহায়তা করা জরুরি। এর মধ্যে থাকতে পারে নগদ অর্থসহায়তা, ইতিবাচক প্যারেন্টিং নিয়ে প্রশিক্ষণ, ডে-কেয়ার সুবিধা, সমাজকর্মীর সহায়তা এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। সরকার, দাতা সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় কমিউনিটি—সবাইকে পরিবারভিত্তিক যত্নব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। আমরা যদি শিশুদের মঙ্গল চাই, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিবর্তে পরিবার ও কমিউনিটিভিত্তিক শিশু সুরক্ষা–ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থ থাকলেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এতিমখানা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রবণতা থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া দরকার।
যেসব শিশু নানা কারণে ইতিমধ্যেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিশু আইনের আওতায় গঠিত শিশুকল্যাণ বোর্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক যত্নের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সরকারি নীতিনির্ধারক, অভিভাবক, কমিউনিটির সদস্য, সেবাদানকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা এখনো খুব সীমিত। এই পরিস্থিতি বদলাতে হবে। কোনো এতিমখানা বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং এতে দান করার আগে আমাদের সবারই একবার ভাবা উচিত, এই সহায়তা কি শিশুকে পরিবারভিত্তিক পরিবেশে রাখার জন্য ব্যবহার করা সম্ভব?
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).
This petiton does not yet have any updates
At 2,000 signatures, this petition becomes one of the top signed on amarabedon.com!
By signing you are agree to the followingTerms & Condition and Privacy Policy.
Reasons for signing.
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).