মেট্রোরেলেও কেন ভ্যাট বসাতে হবে?
0 signaturesof 100,000
-
Petition to
Obaidul Quader -ওবায়দুল কাদের
-
Started by ·
Joni Khan
Why this matters
মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসিয়ে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানির দাম বাড়ানোর (সরকারি ভাষ্যে দাম সমন্বয়) যুক্তি হিসাবে যেমন করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দোহাই দেওয়া হচ্ছে, এ ক্ষেত্রেও সেই একই দোহাই এসেছে।
মেট্রোরেল আমাদের জনগণের সম্পত্তি, সেখানে ভ্যাট বসবে নাকি বসবে না, সেই সিদ্ধান্তে কেন আইএমএফের ‘পরামর্শ’ নিতে হবে? আর আইএমএফ কি মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট বসানোর শর্ত দিয়েছে, নাকি রাজস্ব খাত সংস্কারের শর্ত দিয়েছে? সেই সংস্কার না করে রাজস্ব বাড়ানোর এই অতি সহজ ও অন্যায্য পথ কেন বেছে নিচ্ছে এনবিআর?
যে যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে এনবিআর মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা এককথায় অদ্ভুতুড়ে। ট্রেন, লঞ্চ, বাস শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলে, তাতে ভ্যাটের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব গণপরিবহন এসি হলে তাতে যাত্রীদের বেশ কিছুটা বেশি ভাড়া দিতে হয়।
অপেক্ষাকৃত সচ্ছলেরাই এসি বাস, ট্রেনের এসি কামরা কিংবা লঞ্চের এসি কেবিনে চলাচল করেন। যাত্রী এসিতে যাবে নাকি নন-এসিতে যাবে সেটা তাঁর বেছে নেওয়ার বিষয় । কিন্তু মেট্রোরেলের যাত্রীদের সেটা বেছে নেওয়ার সুযোগ নেই। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ যেমন স্লোগান দিয়েছে, ‘মেট্রোরেল ধনী-গরিব সবার পরিবহন’, বাস্তবতা ঠিক সে রকম না হলেও, মেট্রোরেল মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের গণপরিবহন হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, তাতে নির্দিষ্ট আয়ের এই গোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি চাপে থাকে। অথচ মেট্রোরেলের টিকিটের ওপর ভ্যাট বসিয়ে তাদের ঘাড়ে আরও ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার আয়োজন চলছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর ঢাকায় যাতায়াতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। এখন মোটামুটি গড়ে প্রতিদিন আড়াই লাখের বেশি যাত্রী মেট্রোতে যাতায়াত করছেন। ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচল করেন, সেই বিবেচনায় মেট্রোরেলে সুবিধা মাত্র তিন থেকে পাঁচ শতাংশ যাত্রী পান।
মেট্রোরেল নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের যে খরচ, সেই বিবেচনায়, আশা করা হয়েছিল যে প্রতিদিন পাঁচ লাখ মানুষ এতে যাতায়াত করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী যাত্রী পরিবহন করতে হলে আরও বেশি মেট্রো ট্রেন চালাতে হবে। কিন্তু এখানে বড় শর্ত হচ্ছে, যাত্রীদের মেট্রোরেলে চলাচল করার মতো সামর্থ্য থাকছে কি না।
এমনিতেই ভারত কিংবা পাকিস্তানের চেয়ে আমাদের এখানে মেট্রোরেলের ভাড়া তুলনামূলক বেশি। পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী মেট্রোরেল চললে সাড়ে তিন মিনিট পরপর ট্রেন চলার কথা। কিন্তু এখন ট্রেন চলছে পিক আওয়ারে ৮ মিনিট পরপর আর অফপিক আওয়ারে ১২ মিনিট পরপর।
পূর্ণ সক্ষমতায় মেট্রোরেল চালু করতে হলে নিশ্চিতভাবে লোকবলসহ অন্যান্য ব্যয় বাড়াতে হবে। বর্তমানে মেট্রোরেল যে আয় করে, তা দিয়ে এর ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে। আগামী জুলাই মাসে ১৫ শতাংশ ভ্যাট বসলে যদি সেটা যাত্রীদের দিতে হয়, তাহলে তাদের ব্যয় বাড়বে। তাতে একটা অংশের যাত্রী মেট্রোরেলের সেবা পাওয়া থেকে ছিটকে যেতে পারেন। আর মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে যদি সেটা দিতে হয়, তাহলে তাদের ওপর চাপ পড়বে। যাত্রীর পকেট আর মেট্রোরেল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের সক্ষমতা অর্জন—দুই দিকেই এই ভ্যাট চাপে ফেলবে। এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, অথচ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন যে সরকারের উচ্চমহলের সিদ্ধান্ত ছাড়াই হুট করে এই প্রজ্ঞাপন এসেছে। তাঁর এই বক্তব্য সদিচ্ছা নাকি রাজনৈতিক কথার কথা তা সময়ই স্পষ্ট করবে। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে, আরও গভীর করে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিলে মেট্রোরেলের ঘাড়ে তথা সাধারণ যাত্রীদের ঘাড়ে ভ্যাট চাপানোর এই নীতি কি বাংলাদেশে যে স্বজনতোষী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলছে, তা থেকে খুব বিচ্ছিন্ন কোনো নীতি?
জিডিপির বিপরীতে রাজস্ব আয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে নিচের কাতারের একটি দেশ। অতিধনী তৈরিতে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষে থাকা দেশগুলোর একটি। বৈষম্যের পরিমাপক গিনি সহগ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৯৯। মানে বাংলাদেশ এখন চরম বৈষম্যপূর্ণ দেশে পৌঁছানোর একেবারে শেষ সীমায়।
সামাজিক সাম্যের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ যে ৫৩ বছরে চরম বৈষম্যের একটা দেশে পরিণত হয়েছে, তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতিটা কী? সোজা করে বললে, সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা করে দিয়ে সেটা কিছু গোষ্ঠী, কিছু শ্রেণির কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা। স্বজনতোষী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ট্রিকল ডাউন বা চুইয়ে পড়া ব্যবস্থাটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঠিক উল্টো হয়ে যাচ্ছে।
ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণ শোধ না করে যারা ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে (পড়ুন: ফাঁকা করে দেওয়া), তাদের পুরস্কৃত করে ভালো ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। শেয়ারবাজার থেকে ৪৮ দিনে এক লাখ কোটি টাকা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী তাতে সর্বস্বান্ত হলেন। সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে?
বছরের পর বছর ধরে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে, ক্যাপাসিটি চার্জ তুলে দেওয়া হচ্ছে কয়েকটি কোম্পানিকে। সাড়ে ২৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, চৈত্রের এই গরমে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে গ্রামে ও মফস্বলে পাল্লা দিয়ে চলছে লোডশেডিং।
সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা করার ক্ষেত্রে আলু, পটল, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ডিম, মুরগির সিন্ডিকেটও কম যায় না। দুদিন পরপর একেকটা পণ্যের দাম ইচ্ছেমতো বাড়িয়ে একবারে মুনাফা পুরছে একেকটা সিন্ডিকেট। টানা দুই বছরের টানা মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় হারিয়ে সিংহভাগ মানুষ যখন রীতিমতো জীবনযুদ্ধে ধুঁকছে, তখন রাজস্ব আয় বাড়াতে এই জনগোষ্ঠীকেই সহজ টার্গেট করছে এনবিআর।
সরকারের কাছে, এনবিআরের কাছে, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্য মধ্যবিত্ত—সীমিত আয়ের এই জনগোষ্ঠীই যেন সেই কৃষকের সোনার ডিম পাড়া হাঁস। পেট কেটে সব ডিম একবারে বের না করে নিলে তাদের আর চলছে না।
বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় তলানিতে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কারও কি অর্থনীতিবিদ হওয়ার খুব প্রয়োজন আছে? এখানে যাঁরা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে নানাভাবে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন, তাঁরা কর দেন না। তাঁদের কাছ থেকে কর আদায় করার সক্ষমতা এনবিআরের নেই। কিন্তু প্রতিবছর বাজেট বাড়ানো, সরকারি ব্যয় বাড়ানোর চাপ তো আছেই। তাই এনবিআর ভ্যাট বা পরোক্ষ কর কিংবা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীদের ওপর আয়করের বোঝা চাপায়। বলতে পারেন, কোন বিবেচনায় বছরে যাঁদের মাসিক আয় সাড়ে ২৯ হাজার ১০০ টাকা (করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা), তাঁদের আয়কর দিতে হবে?
প্রজ্ঞাপন জারি করে দিলেই হলো, সাধারণ মানুষের পকেট থেকে খুব সহজেই প্রয়োজন অনুযায়ী পরোক্ষ কর কেটে নেওয়া যায়। বেছে বেছে এসব সহজ উৎস বের করাটাই যা একটা কঠিন কাজ। সে কারণেই বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে কর বসানোর চিন্তা করা যায়, একইভাবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরই কর বসানোর কথা ভাবা যায়। অথচ ডলারের বিনিময় হার বেঁধে রাখার কারণে হুন্ডিতে অর্থ পাঠানোর কারণে ডলার-সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।
একটা দেশে রাজস্ব আয়ে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর যত থাকবে, বৈষম্য তত তীব্র হতেই থাকবে। বৈষম্য কমাতে হলে, প্রত্যক্ষ কর বাড়াতে হবে। মেট্রোরেলের ওপর এনবিআরের ভ্যাট আরোপের একটা বড় কারণ, আগামী অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। এর অর্ধেকের বেশি তারা আদায় করতে চায় পণ্য ও সেবা খাতের ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে। সাধারণ মানুষের পকেটের জন্য এটা নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক খাতে ২ লাখ ২৪ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল এনবিআর। গত জানুয়ারি শেষে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬ কোটি টাকা। (আগামী অর্থবছরে ভ্যাটের চাপ বাড়বে, উদ্বেগ বাড়ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ে; টিবিএস, ০৭ এপ্রিল, ২০২৪)
এক অর্থবছরেই দ্বিগুণের চেয়ে বেশি ভ্যাট আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করছে এনবিআর। ফলে মেট্রোরেল কিংবা এ রকম আরও সেবা খাত, কিংবা পণ্য কিনতে নতুন নতুন ভ্যাট যে জনসাধারণের ঘাড়ে চাপছে, তা বলাই বাহুল্য। আসুন, আমরা যারা আমজনতা, তারা দীর্ঘশ্বাস চেপে অপেক্ষা করি, ভ্যাটের বোঝা আরও, আরও, আরও কতটা ভারী হতে পারে।
Recent supporters
No signatures yet. Be the first to sign.