বিদেশগামী শ্রমিক,ভোগান্তি দূর করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন
0 signaturesof 4,000
-
Petition to
Tarique Rahman
-
Started by ·
Jarin Anjum
Why this matters
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, গ্রামীণ অর্থনীতির গতি, এমনকি লাখো পরিবারের জীবিকার নিরাপত্তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তাঁদের নিরলস পরিশ্রম। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, আর তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সই সচল রাখছে দেশের অর্থনীতির চাকা। তাই প্রবাসীদের গুরুত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি সামাজিক, মানবিক ও নীতিগত অগ্রাধিকারের বিষয়।
সম্প্রতি কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত ‘জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—প্রবাসীরা দেশের চালিকা শক্তি, অথচ অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় তাঁরা নানামুখী ভোগান্তির শিকার হন। এই বৈপরীত্য দূর করা এখন সময়ের দাবি।
অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য একটি বড় সমস্যা। বৈধ প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অনিয়ন্ত্রিত মাধ্যমের ওপর নির্ভর করেন। ফলাফল প্রতারণা, অতিরিক্ত খরচ, ভুয়া প্রতিশ্রুতি এবং বিদেশে গিয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতি। বৈঠকে উঠে এসেছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিবাসী এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন। অথচ এই ‘মাধ্যম’ বা ‘মধ্যস্থতাকারী’ ব্যক্তিদের জন্য এখনো সুস্পষ্ট কোনো আইন বা নিয়ন্ত্রণকাঠামো নেই। অবিলম্বে সাব-এজেন্টদের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণে আইনি কাঠামো প্রণয়ন জরুরি।
সমন্বয়ের অভাব একটি বড় অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন, জনশক্তি কার্যালয়, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, ব্যাংক এবং স্থানীয় সরকার—সব দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়। ওয়ান–স্টপ সার্ভিসের অভাব অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরে সেবা নিতে গিয়ে মানুষ সময়, অর্থ ও মানসিক শক্তি—সবই হারাচ্ছেন। এই সুযোগেই দালালেরা জায়গা করে নিচ্ছে। একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা ওয়েবসাইট, যেখানে অভিবাসনসংক্রান্ত সব তথ্য ও সেবা একসঙ্গে পাওয়া যাবে, তা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে জেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘অভিবাসন কর্নার’ চালু করা গেলে প্রান্তিক মানুষও সহজে তথ্য ও সহায়তা পাবে।
দক্ষতার অভাব বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেকেই কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিদেশে যান, ফলে তাঁরা কম মজুরি পান এবং কর্মক্ষেত্রে শোষণের শিকার হন। অথচ তথ্যপ্রযুক্তি, ড্রাইভিং বা কারিগরি দক্ষতা থাকলে তাঁদের আয় ও সম্মান—দুটিই বাড়তে পারে। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে অনেকেই নির্যাতন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন আটকে রাখা কিংবা আইনি সহায়তার অভাবের মতো সমস্যায় পড়েন। এ ক্ষেত্রে দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী নন; তাঁরা পরিবারের স্বপ্ন, সমাজের উন্নয়ন এবং দেশের মর্যাদার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই তাঁদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হতে হবে সম্মানজনক ও মানবিক।
আশার কথা, সরকার ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এবং আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হলে নীতিগত সংস্কার, আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সাব-এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ, ওয়ান–স্টপ সার্ভিস চালু, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রবাসীদের সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তাঁদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশ নয়, বরং তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। কুমিল্লার গোলটেবিল বৈঠকের আলোচনাগুলো যদি বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তবে তা শুধু একটি অঞ্চলের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হবে।
Recent supporters
No signatures yet. Be the first to sign.