হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু কমছে না; বরং বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ৩১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতা ভরে উঠছে একেকটা পরিবারের প্রিয় সন্তান হারানোর হৃদয়স্পর্শী বিবরণে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে, অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে হাম–রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও, হামের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার ঘাটতি প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আমরা মনে করি, হামের আপৎকালীন চিকিৎসা পরিকল্পনার ঘাটতিতে সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে।
হামের মতো একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বা প্রতিরোধযোগ্য অসুখে দিনের পর দিন শিশুমৃত্যুর ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, গাফিলতি ও ভঙ্গুরতাকে সামনে আনে। সফল টিকাদানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন হাম নির্মূলের পথে এগোচ্ছিল, তখনই এ রোগের প্রাদুর্ভাব আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। সারা দেশে রোগের বিস্তার, বহু শিশুর আক্রান্ত হওয়া, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি—সব মিলিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে হামের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রেখেছে।
দেশব্যাপী হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলায় এবং পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে সব কটি জেলায় হাম–রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। টিকা প্রদানের কাভারেজের হার প্রায় শতভাগ। জনস্বাস্থ্যবিদেরা মনে করছেন, উপদ্রুত এলাকায় ৯৫ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় এলে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে হাম সংক্রমণ কমে আসতে পারে। এটা আশার খবর হলেও ‘আইসিইউ খুঁজতে খুঁজতে শিশুদের প্রাণ নিভে যাওয়া’ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রাদুর্ভাবের দেড় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও হাম মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে, সেটা বোধগম্য নয়। উল্লেখ্য, প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই জনস্বাস্থ্যবিদেরা হামের প্রাদুর্ভাবকে জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করার পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, পিআইসিইউ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট। ফলে অভিভাবকদের তাঁদের সন্তানদের নিয়ে একটি আইসিইউর জন্য মূলত রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় আসতে হচ্ছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে, আইসিইউর সিরিয়াল পেতে পেতেই প্রাণ হারাচ্ছে শিশুরা। এর চেয়ে বেদনাবহ ও দুঃখজনক বিষয় আর কী হতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, পিআইসিইউ সুবিধা কেন থাকবে না। এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। অথচ কোভিড মহামারি ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে আইসিইউ সক্ষমতা গড়ে তোলা কতটা জরুরি কর্তব্য ছিল। মহামারির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশই স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যাগ নিয়েছে। অথচ আমরা যে মহামারি থেকে কোনো শিক্ষা নিতে পারিনি, হামের এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইসিইউর সংকটই তার প্রমাণ দেয়।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্য–গবেষক সৈয়দ আব্দুল হামিদ যথার্থই বলেছেন, হামে শিশুমৃত্যুর মতো ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে: আমরা এখনো প্রতিরোধমূলক রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারিনি, আমরা প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র। এর অর্থ হচ্ছে, আমরা মূলত সংকট দেখা দিলেই নড়েচড়ে বসি, আবার সংকট চলে গেলেই আবার পুরোনো ধারায় চলতে থাকি। হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দর্শনটাকে পাল্টানোর সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আমরা যদি এরপরও শিক্ষা নিতে না পারি, তাহলে আরও বড় জনস্বাস্থ্যগত বিপর্যয় যে সামনে আসছে, সেটা বলা বাহুল্য।
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).
This petiton does not yet have any updates
At 2,000 signatures, this petition becomes one of the top signed on amarabedon.com!
By signing you are agree to the followingTerms & Condition and Privacy Policy.
Reasons for signing.
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).