সাদ্দামদের কেন স্ত্রী–সন্তানের জানাজা পড়ারও অনুমতি মেলে না

সেজাদ হাসান যখন জন্ম নিয়েছে, তখন তার বাবা  জেলখানায়। বাবার আদর-সোহাগ ছাড়াই তার কেটে গেল ৯ মাস। হয়তো সেজাদের মা কানিজ সুবর্ণা অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁর সন্তানের বাবা একদিন জেলখানা থেকে ফিরবে, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কপালে চুমু খাবে, হাত ধরে হাঁটা শেখাবে। কিন্তু না, আমাদের  প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি আর অমানবিক রাষ্ট্রযন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে হয়তো ছোট্ট সেজাদকে মেরে নিজেকে ঝুলিয়ে পৃথিবীর যাবতীয় যাতনা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন সুবর্ণা।

কিন্তু যাঁকে রেখে গেলেন, সেই জুয়েল হাসান সাদ্দাম কি পারবেন নিজেকে ক্ষমা করতে? এই রাষ্ট্র কি পারবে জুয়েলের বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষতগুলোকে উপশম করতে?

শুক্রবার বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসানের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণার (২২) ও তাঁর ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসানের নিথর দেহের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুধু ভাবছি, সেজাদরা আমাদের ক্ষমা করে দেবে তো?

আমাদের এখানে গত কয়েক দশকে যে প্রতিহিংসার রাজনীতি গড়ে উঠেছে তার নির্মম ভুক্তভোগী হতে হয়েছে অসংখ্য পরিবারকে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে রাজনৈতিক মামলায় অসংখ্য মানুষকে দিনের পর দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। সবসময়ই কানিজদের মতো অনেক স্ত্রী তাঁর স্বামীর প্রতীক্ষায় দিন গোনে। সেজাদ হাসানের মতো অনেক শিশুই তার বাবার আদর–ভালোবাসা পেতে চায়। কিন্তু প্রতিহিংসার রাজনীতি যুগের পর যুগ ধরে চলতে থাকায় অনেক সাজানো–গোছানো সংসার তছনছ হয়ে যায়। রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠে থেকে জড়িয়ে পড়া দুর্নীতি আর অনিয়মে অনেক মানুষকে বিপথগামী করে তোলে।

যে নেতা ও দলের কারণে জুয়েলরা জেলে থাকছেন, সেই নেতারা সপরিবারে বিদেশে নিরাপদে ও আরাম-আয়েশে জীবন কাটাচ্ছেন। অথচ এই জুয়েলদের মতো হাজারো পরিবারকে  রাজনৈতিক মামলা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজেদের জমানো সঞ্চয় থেকে শুরু করে মানুষের কাছে ধারদেনা করে উকিল–আদালতে দৌড়াদৌড়ি করছে। অথচ এই দুঃসময়ে পাশে নেই সেই রাজনীতির বড় ভাইগুলো। ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসানের মামলার বিস্তারিত আমি জানি না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁর হাতের লেখা (প্রমাণ করতে পারিনি) বলে দাবি করা চিঠিতে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর যে মামলায় (জিআর ৩০৬/২৪) দেখানো হয়েছে, সেদিন জুয়েল ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিল বলে তাঁর প্রমাণ হিসেবে আদালতে আইনজীবীকে পাসপোর্ট দেখানোর কথা বলা হয়েছে।

এই চিঠির সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে সেটি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে জুয়েল হাসানের ওপর দেওয়া মামলাটির কোনো ভিত্তি নাই। আওয়ামী লীগের আমলে এ ধরনের গায়েবি মামলা করা হতো বিরোধী পক্ষকে দমানোর জন্য। আসামিরা বিদেশে, কিন্তু মামলা হয়েছে দেশে।  

জুয়েলের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাবন্দী থাকায় অনেকটাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন কানিজ সুবর্ণা। মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলেন। সে কারণে তিনি আত্মহত্যা করেন এবং এর আগে তাঁর শিশুকেও হত্যা করেন। সুবর্ণা ও সন্তানের এমন মৃত্যুর দায় আসলে কার? দুই.

জুয়েল হাসানের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় আমরা রাষ্ট্রযন্ত্রের অমানবিক চেহারাটাকেই দেখতে পেলাম। স্ত্রী ও সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখার জন্য ‘প্যারোলে’ মুক্তি পাওয়ার যাবতীয় শর্তই ছিল। সেই মুক্তি না পাওয়ায় জুয়েল হাসানকে তাঁর একমাত্র সন্তানের মুখ শেষবারের মতো দেখতে হয়েছে কারাফটকে। সংবাদমাধ্যমে জুয়েল হাসানের চাচাতো ভাই সাগর ফারাজী জানিয়েছেন, ‘জুয়েলের স্ত্রী ও সন্তান মারা যাওয়ার পর আমরা কারাগারে যোগাযোগ করি। কিন্তু প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়েলের মামা হেমায়াত উদ্দিনের করা একটি ‘প্যারোল’ আবেদন ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রশাসনে সেটা অনুমোদন করেনি। হতে পারে সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা আমলাতন্ত্রের ম্যারপ্যাচ। কিন্তু মানুষের মৃত্যু তো আর ছুটির দিন দেখে আসে না। আইন ও আদালতের গ্রেপ্তার ও মুক্তির বিষয়গুলো তো সাপ্তাহিক দিনক্ষণ দেখে হয় না। জুয়েল হাসানকে কেন প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি সেটা অবশ্যই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ২০১৬ সালের ১ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘প্যারোল মুক্তি–সংক্রান্ত নীতিমালায়’ স্পষ্টত লেখা আছে, বন্দীর মা–বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও আপন ভাই-বোন—এই সাত ধরনের আত্মীয়ের মৃত্যু হলে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা যেতে পারে। সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যায়। আর এ সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের।  

‘প্যারোল’ বিধান থাকায় আসামিরা তাঁদের নিকটাত্মীয়দের মৃত্যুর জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারে, কিন্তু এখানেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।। পত্রপত্রিকায় আমরা সচরাচর দেখি, জানাজায় থাকা আসামিদের হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়। এই ধরনের অমানবিক দৃশ্য আমরা কখনো দেখতে চায় না। সরকারের উচিত হবে, প্যারোলে মুক্তির বিধিবিধানে সংশোধনী আনা। প্যারোলে মুক্তির বিধান কারাগার কর্তৃপক্ষের হাতে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এটা জরুরি প্রয়োজনে মুক্তি, তাই বিধান করে জেল কর্তৃপক্ষের অধীন প্যারোল মুক্তির বিষয়টি থাকা প্রয়োজন। একদিন হয়তো জুয়েলরা মুক্তি পাবে ঠিকই, কিন্তু জুয়েলদের ‘জুয়েল (মূল্যবান সম্পদ)’কে হারানোর ক্ষত কিছুতেই পূরণ করতে পারবে না। আমরা একটা মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি। যে বাংলাদেশে প্রতিটি শিশু থাকবে নিরাপদ। এটা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ নিয়ে যতই সংস্কার হোক, যতই আইন থাকুক, আমরা বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারব না।


Reasons for signing.

See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).

View All resone For signin

Reasons for signing.

See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).

Recent News

This petiton does not yet have any updates

Rani Khatun

Started This Abedon.

25 January 2026   4.5 K

0 have signed. Let’s get to 3,000 !

0%
Treands

At 3,000 signatures, this petition becomes one of the top signed on amarabedon.com!

Sign This

By signing you are agree to the followingTerms & Condition and Privacy Policy.

Must see setitions

মহাসড়কে ভোগান্তির শঙ্কা,ঈদযাত্রায় আগাম প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা জরুরি

মহাসড়কে ভোগান্তির শঙ্কা,ঈদযাত্রায় আগাম প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা জরুরি

প্রতিবছর দুই ঈদে রাজধানী ঢাকা থেকে কমবেশি এক কোটি মানুষ স্বজনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরেন। আনন্দের এই... Sign This
আন্তর্জাতিক নারী দিবস,আইনি বৈষম্য কমাতে জোর পদক্ষেপ চাই

আন্তর্জাতিক নারী দিবস,আইনি বৈষম্য কমাতে জোর পদক্ষেপ চাই

নারী ও পুরুষের সমতার বিশ্ব গড়ার পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বৈষম্যমূলক আইন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, একবিংশ শতকের... Sign This
গরমে লোডশেডিংয়ের শঙ্কা,সরকারকে অবশ্যই কার্যকর পথ খুঁজতে হবে

গরমে লোডশেডিংয়ের শঙ্কা,সরকারকে অবশ্যই কার্যকর পথ খুঁজতে হবে

গ্রীষ্ম মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাটা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরাধিকার সূত্রেই জ্বালানিসংকট ও বিশাল বকেয়ার বোঝা বহন... Sign This
অনিশ্চয়তায় হাজারো কৃষক,ভবদহে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যবস্থা নিন

অনিশ্চয়তায় হাজারো কৃষক,ভবদহে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যবস্থা নিন

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা আর মৌসুমি দুর্ভোগের গল্প নতুন নয়। তবু প্রতিবছর বর্ষা শেষে যখন বিলভর্তি পানি আর ডুবে থাকা... Sign This
ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়ক,দুর্ঘটনার আগেই গাছের গুঁড়ি সরান!

ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়ক,দুর্ঘটনার আগেই গাছের গুঁড়ি সরান!

জাতীয় মহাসড়কগুলো দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এই সড়কে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। খবরে এসেছে, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের... Sign This
টিলা কেটে মাটি বিক্রি,লোহাগাড়ায় প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে

টিলা কেটে মাটি বিক্রি,লোহাগাড়ায় প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পুটিবিলা ইউনিয়নে অবস্থিত ‘কালুনির বর পাহাড়’ নামের সরকারি টিলাকে ধাপে ধাপে কেটে ফেলা হচ্ছে। খবরে এসেছে, রাতের আঁধারে... Sign This
রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ,পণ্য পর্যাপ্ত, দামের লাগাম টেনে ধরতে হবে

রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণ,পণ্য পর্যাপ্ত, দামের লাগাম টেনে ধরতে...

রহমত ও সংযমের মাস পবিত্র রমজান কড়া নাড়ছে। প্রতিবছর এ সময় আসার আগে সাধারণ মানুষের মনে একটিই বড় উদ্বেগ থাকে—বাজারের... Sign This
নীরব এলাকায় হর্ন নিষিদ্ধ,বাস্তবায়নে ডিএমপিকে মনোযোগী হতে হবে

নীরব এলাকায় হর্ন নিষিদ্ধ,বাস্তবায়নে ডিএমপিকে মনোযোগী হতে হবে

রাজধানী ঢাকাবাসীর জীবনে শব্দদূষণ অনেক আগেই বড় ধরনের ঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। ঢাকার ব্যস্ত সড়কে অকারণে হর্ন বাজানো যেন এক স্বাভাবিক... Sign This
বাংলাদেশে ‘ডিজিটাল নাগরিকত্ব’ নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?

বাংলাদেশে ‘ডিজিটাল নাগরিকত্ব’ নিয়ে বিভ্রান্তি কেন?

একটা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। স্মার্টফোন হাতে পেয়েই আমরা সবাই নিজেকে ডিজিটাল পরিসরের একজন সক্রিয় নাগরিক বলে ভাবতে শুরু করেছি।... Sign This
খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চল,ভোটাররা যেন কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন

খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চল,ভোটাররা যেন কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে উঠেছে দূরত্ব, খরচ আর ঝুঁকির কঠিন সমীকরণ। খবরে এসেছে, খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত... Sign This
Loading