দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশ আবার নির্বাচনী ট্রেনে উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণায় চলছে প্রতিশ্রুতি আর বয়ান-পুনর্বয়ানের প্রতিযোগিতা; কিন্তু একটি জায়গায় যুযুধান দুই বড় জোটের প্রতিদ্বন্দ্বীদের বেশ ‘বড় ঐক্য’ দেখা যাচ্ছে।
শিক্ষা, বিশেষত ও উচ্চশিক্ষার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ অথচ বেহাল বিষয়কে সুস্থির করার মহাপরিকল্পনায় অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই তারা নিশ্চুপ। বিচ্ছিন্নভাবে এই এলাকায় কলেজ, ওই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন অনেকে; কিন্তু শিক্ষা প্রশ্নে জাতীয় নীতিমালা নিয়ে আলোচনা নেই।
নতুন সরকার যারাই গঠন করুক; কিংবা যে কাঠামোতেই গঠিত হোক, তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চশিক্ষার বেহাল অস্থিতিশীলতাকে মোকাবিলা করা। এমনিতেই উচ্চশিক্ষা নিয়ে বৈশ্বিক টালমাটাল পরিস্থিতি চলছে, বাংলাদেশিদের জন্য দ্বার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে সেটি সামলানো প্রয়োজন। তবে তার আগে নতুন সরকারের অনিবার্য দায়িত্ব হবে ঘরোয়া পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সংকটগুলো নিয়ে বিস্তারিত ভাবা এবং ‘উচ্চশিক্ষা কমিশনের’ গতিমুখ উন্মোচন করা।
বাজারের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সম্পর্ক নির্ধারণ
মারাত্মক বাজারকেন্দ্রিকতা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা। আদতে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাটাই জ্ঞানভিত্তিক না হয়ে অতিরিক্ত কর্মকেন্দ্রিক; দুনিয়াব্যাপীই তাই। আগে ছিল ‘ছাত্রনং অধ্যয়নং তপোঃ’, এখন হয়েছে ‘ছাত্রনং কর্মনং তপোঃ’! মানে শিক্ষার সঙ্গে বৈষয়িকতার সংযোগ নিবিড় হয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের করাতকলে শিক্ষার এই বৈষয়িক ব্যবস্থাপনার শুরু। উত্তরোত্তর সেটি বেড়েছে এবং আজ প্রাদুর্ভাবে পরিণত হয়েছে। বিদ্যার্জনের মান যেমনই হোক, ভালো গ্রেড ও সনদই শেষ কথা। শিক্ষায় এ জন্য ঢুকে গেছে অতিরিক্ত বাণিজ্যমনস্কতা—সারা বিশ্বেই।
অবশ্য বাংলাদেশের মতো জনশক্তির অপব্যয়ের উদাহরণ বিশ্বব্যাপী খুবই কম। এ দেশে উচ্চশিক্ষার কোনো গবেষণামুখী গন্তব্য ও উদ্দেশ্য নেই। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য বরং ভালো চাকরি করা হওয়ায়, পঠিত ডিসিপ্লিনের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক কম। সাহিত্য পড়ে তাই এ দেশে ব্যাংকার হওয়া যায়। আর জনপ্রশাসনমুখী চাকরির কথা বাদই দিলাম। এই একটি চাকরি বা সোনার ডিমপাড়া হাঁস, যার জন্য চিকিৎসা বা প্রকৌশলের গ্র্যাজুয়েটরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। পাঠ্যসূচির পড়ালেখা বা সহপাঠ্যক্রমের বনিয়াদি জ্ঞানান্বেষণ বাদ দিয়ে প্রথম বর্ষ থেকেই সরকারি চাকরির প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। এর চেয়ে বড় মানবসম্পদের অপচয় আর কী হতে পারে!
বাজারের প্রভাবকে বাস্তবতার কারণেই অস্বীকার করা যাবে না; কিন্তু তা বলে বাংলাদেশে এভাবে জনগণের অর্থ ও মানবসম্পদের অপচয় হতে দেওয়া হবে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও নীতির অভাবে? বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু ‘ক্যাডার’ তৈরির কারখানা হয়ে থাকবে? গুণগত কাঠামোর কি কোনো পরিবর্তনই সাধিত হবে না? জনপ্রশাসনের লোকবল তৈরির জন্য উচ্চমাধ্যমিকের পরেই কেন ভাবা হবে না স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের কথা? উচ্চশিক্ষার নগরকেন্দ্রিকতা
উপনিবেশ কালে ভারতবর্ষে নগরায়ণ ধারণার একটি বর্ধিত শাখা বা এক্সটেনশন হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়। নগরের শানশওকত বৃদ্ধি ও উন্নয়ন দেখানোর লোকরঞ্জনবাদী (পপুলিস্ট) জিয়নকাঠি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। নগর যেহেতু ব্যবসাকেন্দ্র, সেই ব্যবসাকেন্দ্রের জন্য থমাস ব্যাবিংটন মেকলে-কথিত ঔপনিবেশিক মননজাত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তৈরির কারিগর ছিল ইংরেজি ভাষা ও ব্রিটিশ মডেলের বন্দরকেন্দ্রিক তথাকথিত ‘আধুনিক’ বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা। সেই ঔপনিবেশিক মনোজগৎ থেকে আমরা আজও বেরোতে পারিনি।
বাংলাদেশেও নগরায়ণ ও বিশ্ববিদ্যালয় পরস্পরের পরিপূরক। যত বিশ্ববিদ্যালয়, তত নগরায়ণ—লোকরঞ্জনবাদী উন্নয়নের এই হলো মডেল ও মানদণ্ড। পুঁজি এসে পুঞ্জীভূত হচ্ছে এই এককেন্দ্রিক নগরকাঠামোয় এবং স্বভাবতই পুঁজির তাড়নায় নগরমুখী হচ্ছে মানুষ। যে কারণে সব বড় শহরে, বিশেষত রাজধানীতে প্রান্তিক জনপদের তরুণ-তরুণীরা ঠাঁই পেতে মরিয়া। আর সেটিরই প্রবেশদ্বার হলো এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
বলা বাহুল্য, বিদ্যায়তনিক গুণমান যা-ই হোক না কেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঐতিহ্য আর বাজারে তাদের সনদের উচ্চ কদর অনেকাংশেই একটি ‘ভানুমতীর খেল’ হিসেবে ভূমিকা পালন করে। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সুযোগ পেতে শিক্ষার্থীরা জীবন বাজি রাখেন। পরোক্ষে থাকে নগরজীবন ও তার বাজার-ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়ার হাতছানি। এভাবেই নগরগুলোতে জনঘনত্ব বাড়তে থাকে।
বিকেন্দ্রীকরণের নামে ‘বিশ্ববিদ্যালয়বাজি’
নগরকেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার কাঠামোকে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই বিকল্প বলতে রাষ্ট্র বুঝল জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা! এটা আদতে বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি, হয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয়বাজি’। এর উদ্দেশ্য নিয়ে আগেও বলেছি। পরিবারতন্ত্র-দলতন্ত্রের স্থায়ী বিজ্ঞাপন, লোকরঞ্জনবাদী উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন এবং দলীয় টেন্ডারবাজদের সুবিধা দিতে যেভাবে একের পর এক গৃহহীন-ভূমিহীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ তকমায় বিভূষিত করা হয়েছে, তার গাণিতিক ক্ষতি পরিমাপ করা মুশকিল।
বিকেন্দ্রিকতার স্বার্থে প্রয়োজন ছিল কর্মমুখী বিদ্যায়তন গড়ে তোলার। কিন্তু শুধু উন্নয়নের জনপ্রিয় ‘কাঁসর–ঘণ্টা’ বাজানোর অভিপ্রায়ে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটিকে যেভাবে সহজলভ্য করে তোলা হয়েছে ছোট্ট এই দেশে, তা সত্যই অনভিপ্রেত। বস্তুত উচ্চশিক্ষার কাঠামো হওয়া উচিত খুবই সুপরিকল্পিত ও চাহিদাভিত্তিক। বিকেন্দ্রীকরণের নামে অপরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গ্র্যাজুয়েটরা ‘শিক্ষা ও চাকরিস্ফীতি’র চক্করে পড়ছেন। কেননা, এই উচ্চশিক্ষিত মানুষদের জন্য সে মাত্রায় চাকরির বাজার রাষ্ট্র তৈরি করতে পারেনি।
এ রকম অবস্থায় উচ্চশিক্ষাকে জনকল্যাণমুখী করতে হলে পরিষ্কার দুটি ধারা তৈরি করা দরকার। একটি হবে গবেষণামুখী, অপরটি হবে বাজারমুখী বা কর্মমুখী শিক্ষা। গবেষণামুখী করতে হলে আমাদের প্রয়োজন পোস্টগ্র্যাজুয়েট বা স্নাতকোত্তর বিশ্ববিদ্যালয়। সেদিকে কোনো সরকারই মনোযোগ দেয়নি। অথচ পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ‘স্নাতকোত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ে’ রূপান্তর করে গবেষণায় পরিপূর্ণ মনোযোগ দেওয়া এখন অনিবার্য হয়ে গেছে।
অন্যদিকে বাজারভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজন গ্র্যাজুয়েট বা স্নাতক পর্যায়ের ইনস্টিটিউটের, যেগুলো বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ স্নাতক তৈরি করবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান বা কলা ও মানবিকের মতো ডিসিপ্লিনের জন্য; এখন মেডিক্যাল কলেজগুলো যেটি করছে; কিন্তু আমাদের একটি জাতিগত ঘোড়ারোগ তৈরি হয়েছে—নাম ও পরিচয়ের সঙ্গে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ শব্দটি যোগ না হলে আমাদের অহমে আঘাত লাগে! বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ কিংবা ইনস্টিটিউটের পড়ার কথা শুনলেই আমরা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠি!
যততত্র অপরিকল্পিত বিশ্ববিদ্যালয় আর বাজারের সঙ্গে সম্পর্কহীন অপ্রয়োজনীয় বিভাগ খুলে জনগণের অর্থ অপচয়ের এটিও একটি জনতুষ্টিবাদী কারণ। এটি মোটেও উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণ নয়।
সাত কলেজ: একই বৃত্তে ঘুরপাক
বলা বাহুল্য, উচ্চশিক্ষার বিকেন্দ্রীকরণের কাঠামোকে এই রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকেরা অত্যন্ত ভুলভাবে পাঠ করেছেন। সে জন্যই রাজধানীর পুরোনো সাত কলেজের সমস্যাটি বড় আরেকটি গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে এগুলো এখন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে ‘সংযুক্ত’ হয়েছে। কিন্তু মূল সংকট তৈরি হয়েছে কাঠামো নিয়ে।
প্রাথমিক খসড়ায় হাইব্রিড মডেলে স্বতন্ত্র স্কুলভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রস্তাব ছিল। এই হাইব্রিড মডেলের দুর্বলতার সমালোচনাকে ঢাল বানিয়ে স্বতন্ত্র স্কুলভিত্তিক কাঠামোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে দাবি করলেন—নিজেদের কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় উঠিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামলেন উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাবেক জগন্নাথ কলেজের মতো কর্মস্থল ত্যাগ করতে হবে, ফলে তাঁরাও আন্দোলনে নামলেন। সব মিলিয়ে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা!
পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বশেষ পরিমার্জিত যে খসড়া প্রস্তাব অধ্যাদেশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার অনুমোদন দিয়েছে, তা আদতে শব্দ ওলট-পালটের বাহুল্য কেরামতি ছাড়া কিছু নয়। অধিভুক্ত কলেজের জায়গায় সংযুক্ত কলেজ, অনুষদের বিকল্প ‘স্কুল’, ডিনের বিকল্প ‘হেড অব স্কুল’ ইত্যাদি আসলে নতুন কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন নয়। উচ্চমাধ্যমিক রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগাখিচুড়ি মডেল শিক্ষা কার্যক্রমের সংকটকে মূলত ঘনীভূতই করবে। আদতে কাঠামোগত ত্রুটির কারণে নতুন মোড়কে সেই পুরোনো পণ্যই বিক্রি করা হলো। এই কলেজগুলো নিয়ে দীর্ঘ প্রায় এক দশক (২০১৭-২৬) ধরে যে ‘টম-জেরির কাহিনি’ চলছে, সেই কাহিনি আসলে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ!’
এই আপাত অসমাপ্ত গল্পটি অবশ্য শুধু সাত কলেজের চাপান-উতোরেই সীমিত থাকবে না। লেখার একদম শুরু থেকে আমরা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার যে কাঠামোগত বা ফ্রেমওয়ার্ক–বিষয়ক সমস্যা নিয়ে কথা বলছি, তাতে একটি বড় অংশীদার হিসেবে বাদ থেকে যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলো। এই কলেজগুলো থেকে যে গ্র্যাজুয়েটরা বের হচ্ছেন, চাকরির বাজারে তাঁদের অবস্থান কী, কলেজগুলোর বাজারের সঙ্গে সম্পর্কই–বা কী, এগুলোর শিক্ষার গুণমান কেমন, মৌলিক উদ্দেশ্য কী—এসব নিয়ে কোনো জাতীয় মূল্যায়ন আজও পর্যন্ত নেই। অথচ সাধারণ চোখে এসব কলেজের শিক্ষার্থীরা বাজারের কাছে ‘সৎসন্তানের’ বেশি কিছু নন।
শ্রেণিবৈষম্যমূলক সমাজে, যেখানে প্রতিযোগিতাকে ধরা হয় প্রতিভা মূল্যায়নের একমাত্র মানদণ্ড, সেখানে সবচেয়ে অপরায়নের শিকার এই শিক্ষার্থীরা। অথচ তাঁদের বাজারকেন্দ্রিক কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে জনশক্তিতে রূপান্তর করার বিকল্প নেই। কর্মসংস্থানের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ছাড়া রাষ্ট্রের বিপুল জনগোষ্ঠীকে নামকাওয়াস্তে ‘উচ্চশিক্ষিত’ করা কোনো দূরদর্শী রাষ্ট্রপরিকল্পনা হতে পারে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল একটি ব্যর্থ প্রকল্পের নামান্তর, যা উচ্চশিক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণের অন্যতম বড় বাধা। সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিও তা-ই হবে। এভাবে উচ্চশিক্ষাকে সেই একই বৃত্তে ঘুরপাক খাইয়ে অংশীদারদের সঙ্গে স্রেফ প্রতারণাই করা হলো।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: মান ও নির্মাণের সংকট
বহুধাবিভক্ত বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার কাঠামোয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সেটি এতটাই যে নগরকেন্দ্রিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মেষ ও উত্তরোত্তর উত্থানের সঙ্গে অধিভুক্ত কলেজগুলোর ব্রাত্য হয়ে যাওয়ার সম্পর্ক খুবই নিবিড়। শুধু কলেজগুলো কেন, অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল শ্রেণির কাছে জেলাভিত্তিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও আকর্ষণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম কুড়ানো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কম; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুণে-মানে অসামান্য হয়ে উঠেছে।
শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বিদ্যাচর্চার মান প্রশ্নসাপেক্ষ। সনদকেন্দ্রিক ও বাণিজ্যনির্ভর উচ্চশিক্ষার পসরা সাজিয়ে যেভাবে এগুলো চলছে, তা কতটা শিক্ষাসেবা আর কতটা মুনাফার অভিলাষ, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের মতো নির্মাণের সংকট নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। নির্মাণ–সংকট মানে শুধু ভৌত অবকাঠামো (ভাড়া ভবন বা স্থায়ী ক্যাম্পাস) থাকা বা না-থাকা নয়; নির্মাণ-সংকট আরও গভীরভাবে গাঠনিক অর্থাৎ কাঠামোগত গঠনের। এককালে অলি-গলিতে ভবন ভাড়া করে গজিয়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ‘সুদিন’ আইনের কড়াকড়ির কারণে অনেকাংশেই আজ বিলুপ্তপ্রায়। কিন্তু তার মৌলিক যে সমস্যা, গাঠনিক বা কাঠামোগত ত্রুটি, সেটি উত্তরোত্তর ভয়াবহ হচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন (২০১০) দিয়েও এই ত্রুটি দূর করা যাচ্ছে না; বরং গাঠনিক ত্রুটির বলি হতে হচ্ছে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত। ব্যতিক্রম ছাড়া বহুলাংশেই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন-তখন ছাঁটাইয়ের জুজু, নিম্ন বেতনকাঠামো, পদোন্নতির সংকট, বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাসহ যথাযথ চাকরি বিধিমালার অভাব রয়েছে। সঙ্গে রয়েছে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার অস্বচ্ছতা ও শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক অনেক অসংগতি। সম্প্রতি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অযৌক্তিকভাবে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা কাঠামোগত ত্রুটির জলজ্যান্ত উদাহরণ। এই পুরো অস্থিতিশীলতার প্রভাব শিক্ষকদের পারফরম্যান্সে পড়তে বাধ্য এবং সেই প্রভাব গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমের ওপরেও আসলে পড়ে।
শেষ কথা
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা থাকলেও সংকটগুলো অতলান্তিক। এর সিংহভাগ এতটাই কাঠামোগত যে বুঝতে হলে খোদ নীতিনির্ধারকদেরই গভীর অনুধ্যান প্রয়োজন। রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার বাস্তবিক বোঝাপড়া এখন বেশি জরুরি।
নির্বাচনের ময়দানে প্রতিশ্রুতি দেওয়াই যায়, বিশেষ জেলায় সিটি করপোরেশন, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা রাজধানীতে নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন; কিন্তু এটি নগরকেন্দ্রিক সেই ‘বিশ্ববিদ্যালয়বাজি’র পুনরাবৃত্তি। রাজনীতিবিদেরা এই ‘বিশ্ববিদ্যালয়বাজি’র রোগ থেকে মুক্ত না হলে বাংলাদেশের অস্থিতিশীল উচ্চশিক্ষা আরও অসার হবে। তাহলে হালটা ধরবেন কে?
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).
This petiton does not yet have any updates
At 2,000 signatures, this petition becomes one of the top signed on amarabedon.com!
By signing you are agree to the followingTerms & Condition and Privacy Policy.
Reasons for signing.
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).