ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন কেবল নাগরিক সেবার প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির এক দুষ্টচক্রের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য। রাজনৈতিক পরিচয়, পেশিশক্তি ও স্থানীয় আধিপত্যই এই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপাদান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ক্ষমতার পালাবদল হলেও এই বাণিজ্যের চরিত্র বদলায়নি; শুধু চাঁদা নেওয়ার লোক বদলেছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী, বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের জন্য মাসিক ফি সর্বোচ্চ ১০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় আদায় করা হচ্ছে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা, কোথাও কোথাও তারও বেশি। বনানী ও গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাটপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অথচ নাগরিকেরা ইতিমধ্যে গৃহকরের সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা বাবদ কর পরিশোধ করছেন। অর্থাৎ একই সেবার জন্য তাঁদের দ্বিগুণ অর্থ দিতে হচ্ছে—একবার রাষ্ট্রকে, আরেকবার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজ চক্রকে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা ভয়াবহ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় কাউন্সিলর ও দলীয় নেতা-কর্মীরা এই খাত নিয়ন্ত্রণ করতেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বহু নেতা-কর্মীর হাতে চলে গেছে। মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী, উত্তরা, বাসাবো, খিলগাঁও কিংবা পুরান ঢাকা—সব জায়গায় একই অভিযোগ। কোথাও যুবদল, কোথাও স্বেচ্ছাসেবক দল, কোথাও ছাত্রদল বা থানা বিএনপির নেতারা নিজেদের মধ্যে সড়ক ও এলাকা ভাগ করে নিয়েছেন। বনানীতে ২৮টি সড়ককে ১২ ভাগে ভাগ করে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে’ ময়লা-বাণিজ্য পরিচালনার কথাও উঠে এসেছে।
এটি নিছক দুর্নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি। সিটি করপোরেশন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হয়েও কার্যত অনেক ক্ষেত্রে অসহায় দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। প্রশাসকেরা বিশৃঙ্খলার কথা স্বীকার করছেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন; কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না। এমনকি গুলশান সোসাইটির মতো প্রতিষ্ঠানও ‘অদৃশ্য শক্তির’ বাধায় পুরো এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে না।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, এই পুরো ব্যবস্থা এখন অনেকের কাছে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে গেছে। এমনকি কিছু রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন যে আগে যেমন চলত, এখনো তেমনই চলছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটি একধরনের অনানুষ্ঠানিক অর্থ সংগ্রহের খাত হয়ে উঠেছে। ফলে এটি আর নাগরিক সেবা নয়; বরং ভাগ-বাঁটোয়ারার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ সরাসরি সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের নিয়োগ, বিল নির্ধারণ ও তদারকি সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্ধারিত ফি প্রকাশ্যে টানিয়ে রাখতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এই খাতে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া যাবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। চতুর্থত, নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে ওয়ার্ডভিত্তিক মনিটরিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
ঢাকা শহরের ময়লা ব্যবস্থাপনা আমাদের নগর পরিচালনার গভীর অসুস্থতার চিহ্ন। এই অসুস্থতা দূর করতে হলে গোটা ব্যবস্থাটিই বদলাতে হবে।
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).
This petiton does not yet have any updates
At 3,000 signatures, this petition becomes one of the top signed on amarabedon.com!
By signing you are agree to the followingTerms & Condition and Privacy Policy.
Reasons for signing.
See why other supporters are signing, why this petition is important to them, and share your reason for signing (this will mean a lot to the starter of the petition).